কেমন আছেন ভাষা আন্দোলনে প্রথম আত্মনিবেদিত শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের পরিবারবর্গ?

কে,আই,রাব্বি:
কেমন আছেন ভাষা আন্দোলনে প্রথম আত্মনিবেদিত শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের পরিবারবর্গ? ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় পারিল বলধারা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। রফিকউদ্দিনের পিতার নাম আবদুল লতিফ ও মাতার নাম রাফিজা খাতুন। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী, কলকাতায় ব্যবসা করতেন।

রফিকউদ্দিনের শৈশবের পড়ালেখা শুরু কলকাতার ‘মিত্র ইনস্টিটিউটে’। এরপরে মানিকগঞ্জের ‘বায়রা স্কুলে’। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রফিকউদ্দিনের পিতা ঢাকায় চলে আসেন। এখানে বাবুবাজারে আকমল খাঁ রোডে পারিল প্রিন্টিং প্রেস নামে ছাপাখানা চালু করেন। বায়রা স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করে রফিকউদ্দিন মানিকগঞ্জ ‘দেবেন্দ্রনাথ কলেজে’ বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। আই.কম. ক্লাস পর্যন্ত পড়লেও পরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় এসেপিতার সঙ্গে প্রেস পরিচালনা করতে শুরু করেন। পরে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

শহীদ রফিকের একই গ্রামের মেয়ে রাহেলা খাতুন পানুর সাথে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি বিয়ের শাড়ি-গহনা ও কসমেটিক্স নিয়ে সন্ধ্যায় তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই মহান ব্যক্তি যখন শুনতে পেলেন বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে মিছিল বের হবে তখন তিনি ছুটে যান এই মিছিলে। তৎকালীন সরকার কর্তৃক আরোপিত ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র জনতার সাথে তিনিও বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণ ও মিছিলের পদভারে প্রকম্পিত পুরো রাজপথ। এ অবস্থা দেখে পাকিস্তান সরকার দিশেহারা হয়ে উঠে। ফলে নির্বিচারে ছাত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। একটি গুলি রফিকউদ্দিনের মাথায় বিদ্ধ হয়ে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ছয় সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। তাদের মাঝে ডা. মোশাররফুর রহমান খান রফিকের গুলিতে ছিটকে পড়া মগজ হাতে করে নিয়ে যান। রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় ঢাকার আজিমপুর গোরস্তানে শহীদ রফিকের লাশ দাফন করা হয়। তবে দুঃখজনকভাবে পরবর্তীতে তার কবর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের পরিবার মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রফিকনগর (পূর্বনাম পারিল) গ্রামে বসবাস করেন। তাঁর পরিবারের প্রধান সদস্যদের তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

তাঁর বাবার নাম আবদুল লতিফ এবং মাতার নাম রাফিজা খাতুন তাঁর বাবা কলকাতায় প্রেস ব্যবসা করতেন।রফিক ছিলেন সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় (পাঁচ ভাই ও দুই বোন)। খোরশেদ আলম, রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই, যিনি বর্তমানে মানিকগঞ্জ সদরে সরকারি বরাদ্দকৃত বাড়িতে থাকেন । আবদুস সালাম, রফিকের মেজো ভাই, যিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আবদুর রশিদ, রফিকের ছোট ভাই। রফিকের শাহাদাতের পর তাঁর বাগদত্তা পানু বিবির সাথে রশিদের বিয়ে হয়। বাগদত্তা (পানু বিবি), শহীদ রফিকের বিয়ের কথা ঠিক হয়েছিল তাঁর মামাতো বোন রাহেলা খানম পানুর সাথে। রফিকের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে পরিবারের সিদ্ধান্তে ছোট ভাই আবদুর রশিদের সাথে পানু বিবির বিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে ঢাকার পুরানা পল্টনে ছেলের বাসায় থাকেন। অন্যান্য সদস্য, পৈতৃক ভিটায় বর্তমানে রফিকের বড় ভাই আব্দুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম এবং ভাতিজা শাহজালাল বসবাস করতেন। গোলেনূর মারা যাবার পর এখন শুধু থাকেন শাহজালাল। বর্তমানে তাঁর গ্রামের বাড়িতে সরকারের পক্ষ থেকে ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। শহীদ রফিকের পরিবারবর্গ বলতে গেলে সবাই প্রতিষ্ঠিত।

শহীদ রফিকের বর্তমান একমাত্র দৃশ্যমান স্মৃতি তার নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি জাদুঘর।বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিক্রমে গত ২০০৮ সালের ১৫ মে ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের স্মৃতিকে চিরজাগ্রত রাখতে তাঁর জন্মস্থান সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের পারিল গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর নামকরণ করা হয়েছে এবং সেখানে এক বিঘা জায়গার উপরে গড়ে উঠেছে শহীদ রফিক আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। জাদুঘরটি উদ্ভোধন করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উদ্যোগ গ্রহণ করেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল।

একটি বেসরকারি সংস্থা শহীদ রফিক জাদুঘর স্থাপন করে ভাষাশহীদ রর্ফিকের নিজ বাসভবনে। রফিকের বেশকিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে এখানে। এছাড়া বাংলা একাডেমি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সংগঠন থেকে দেওয়া দশ হাজারের মতো বই রয়েছে এ জাদুঘরে। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের পরিবারকে সরকার থেকে সম্মানী ভাতা প্রদান করা হয়। যেহেতু শহীদ রফিক অবিবাহিত ছিলেন, তাই তাঁর মাকে এই সম্মানী ভাতা দেওয়া হতো। এখন মায়ের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের রাষ্ট্রপ্রদত্ত এই সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়।

শিরোনাম