সংবাদ জমিন,অনলাইন ডেস্কঃ
সালটা ২০১৯। দীর্ঘ ১৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন। তৎকালীন ছাত্রলীগের তোপের মুখে থেকেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ঢোকে ছাত্রদল। তৈরি হয় নির্বাচনি পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলাও শুরু হয়। জাতীয় রাজনৈতিক নেতা এবং মূলধারার গণমাধ্যম, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভিড় বাড়তে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। যেন জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ডাকসু নির্বাচন। হবেই না কেন, ডাকসু থেকে নির্বাচিত সব নেতাই জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব স্থানে রয়েছেন।
ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান কিংবা আশির দশকজুড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক সংগ্রামে ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ছাত্র সংসদ গঠনের কালঃ
১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই স্যার এ. এফ. রহমানের উদ্যোগে মুসলিম হল, জগন্নাথ হল ও ঢাকা হলে ছাত্র সংসদ গঠন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ। হল ছাত্র সংসদের সাফল্যের পর কেন্দ্রীয়ভাবে ১৯২২-২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ গঠিত হয়। প্রত্যেক হল থেকে তিন জন করে ছাত্র এবং একজন শিক্ষক, আর উপাচার্যের মনোনীত একজন শিক্ষক—এদের নিয়ে গঠিত হয় ছাত্র সংসদ। তখন শিক্ষকদের মধ্যে একজন সভাপতি হতেন।
১৯২৩ সালে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ৩৭ বার ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সরকারগুলোর মধ্যে এক ধরনের অনীহা দেখা যায়। যার ফলে ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১৯ বার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৭ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের পর ২০১৯ সালের নির্বাচনে সহ-সভাপতি হন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুর এবং সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) গোলাম রাব্বানী।
ডাকসু যেভাবে ধারাবাহিকতা হারালোঃ
১৯৯০ সালের পর ১৯৯১ সালের ১৮ জুন ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সময় সহিংসতার কারণে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণে নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী উপাচার্য হওয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৯৮ সালে ডাকসু কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর থেকে মাঝে মাঝে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। সিনেটে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও এসেছে। তাতে কোনও ফল পাওয়া যায়নি।
২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণে নির্বাচনটি বাস্তবায়িত হয়নি। এই সময় ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করলেও ছাত্রলীগের প্রতিরোধের কারণে তাদের দাবি সফলতা পায়নি।
এরপর ২০১২ সালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, ধর্মঘট, কালো পতাকা মিছিল এবং ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চ’ তৈরি করা হয় এবং লাগাতার আন্দোলনও চলে বেশ কিছু দিন। তবে নির্বাচনের দাবি উঠলেও তা খুব জোরালো হয়নি।
২৮ বছর পরে ভিপি নুরঃ
দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি হিসেবে বিজয়ী হন নুরুল হক নুর। প্রায় দুই হাজার ভোটের ব্যবধানে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে পরাজিত করেন তিনি। নুরুর প্রাপ্ত ভোট ছিল ১১ হাজার ৬২টি। সেসময় কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকবার হামলার মুখে পড়েন নুর।
স্বাধীনতার পর ডাকসুর শীর্ষ পদে ছিলেন যারাঃ
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে সাতবার। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা ডাকসুর শীর্ষ পদে জায়গা পাননি। বরাবরই জয়ী হয়েছেন বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী, বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। ১৯৭৩ সালে ডাকসু নির্বাচন হলেও কর্তৃপক্ষ ফলাফল স্থগিত করে। এর প্রায় ৬ বছর পর ১৯৭৯ সালে জাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেলে ভিপি হয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান। ১৯৮০ সালে মাহমুদুর রহমান মান্না দ্বিতীয়বারের মতো ভিপি নির্বাচিত হন বাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান। এরপর ১৯৮২ সালে আখতারুজ্জামান ভিপি নির্বাচিত হন এবং জিএস হন বাসদ-ছাত্রলীগের জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ভিপি এবং জাসদ ছাত্রলীগ থেকে মুশতাক আহমেদ জিএস নির্বাচিত হন। এই প্যানেলটি ছিল ছাত্রলীগসহ বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি যৌথ প্যানেল। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল জয়লাভ করে। এ সময় আমানউল্লাহ আমান ভিপি নির্বাচিত হন এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন।
এবারের নির্বাচনঃ
২০১৯ সালের পর চলতি বছর আবারও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ডাকসু নির্বাচন সবার আগে হচ্ছে। নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এবার ডাকসুর ২৮টি পদের বিপরীতে মোট ৪৭১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী আছেন ৬২ জন। প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, ডাকসুতে ৪৭১ প্রার্থীর মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ৪৫ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৯ জন, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২৫ জন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে ১৭ জন, কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ১১ জন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ১৪ জন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১৯ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ১২ জন, গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ৯ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১৩ জন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১২ জন, সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৭ জন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ১৫ জন, মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক পদে ১১ জন, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ ছাড়া ১৩টি সদস্য পদে ২১৭ জন প্রার্থী হয়েছেন।