আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বজুড়ে পারস্য সংস্কৃতির পদচিহ্ন বলে দেয় ইরানকে হারানো অসম্ভব। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাস। তেহরানে এক বিশাল সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন সাইয়্যেদ আলী খামেনি। তিনি তিন বছর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সেদিনের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবাল। ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেওয়া ইকবাল কখনোই ইরান সফর করেননি। কিন্তু খামেনির দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন এক ‘দীপ্তিমান স্ফুলিঙ্গ’, যার কবিতা ও দর্শন ইরানিদের হৃদয়ে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল ছবি এঁকে দিয়েছিল।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা ইকবালের দর্শনে এতটা প্রভাবিত হতে পেরেছিলেন কারণ ইকবালের রচনার একটি বড় অংশ ছিল ফারসি ভাষায়। এখন ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের দামামার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে। যদিও এখন বলকান থেকে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত সেই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জগতটি কেবল হারিয়েই যায়নি, বরং আধুনিক রাজনীতির ডামাডোলে মানুষ সেই স্মৃতিটুকুও ভুলতে বসেছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ইতিহাসবিদ শাহাব আহমেদ এই বিশাল অঞ্চলকে ‘বলকান-টু-বেঙ্গল কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইউরোপের বলকান থেকে শুরু করে তুরস্ক, ইরান, মধ্য এশিয়া হয়ে আফগানিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল এই পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব। ১৬ থেকে ২০ শতক পর্যন্ত ওসমানীয় সাম্রাজ্য, মুঘল ভারত এবং সাফাভিদ ইরান সবখানেই আভিজাত্য, পোশাক, স্থাপত্য এবং বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্যের প্রধান ভাষা ছিল ফারসি।
সেই সময়ে এই অঞ্চলের অভিজাত শ্রেণিদের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল ছিল। তারা একই ঘরানার সাহিত্য ও চিত্রকর্ম পছন্দ করতেন। তাদের মসজিদ, প্রাসাদ ও মকবারা নির্মাণে একই ধরনের কারুশৈলী ব্যবহৃত হতো। শাহাব আহমেদের মতে, এই সংস্কৃতি কেবল উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং কবিতা ও সংগীতের মাধ্যমে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ফারসি হয়ে ওঠে শাসনের প্রধান ভাষা। ১৬ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের হাত ধরে এই অঞ্চলে পারস্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে। আগ্রার তাজমহল যার সবচেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ, যেখানে পারসিক ও স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন ঘটেছে। বিরিয়ানি, হালিম ও নিহারির মতো জনপ্রিয় খাবারগুলোও এই মিশ্র সংস্কৃতিরই দান।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন যুক্তি দেখান যে, ভারত তখন একটি ‘পারস্য প্রভাবিত বিশ্বের’ অংশ ছিল, যা সর্বজনীন ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ধারণ করত। সম্রাট আকবর মহাভারত ও রামায়ণের ফারসি অনুবাদ করিয়েছিলেন। ১৭ শতকের দিকে ভারতের শিক্ষিত সমাজ আরবি, ফারসি, তুর্কি ও হিন্দি (পরবর্তীতে উর্দু) জানা আবশ্যক মনে করত। লেখক আর্থার ডুডনির মতে, এক সময় ইরান নয়, বরং ভারতই ছিল ফারসি সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কেন্দ্র।
পারস্য সংস্কৃতির কেন্দ্রে ছিলেন মধ্যযুগের ইরানি কবি হাফিজ শিরাজি। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ইরান, আফগানিস্তান ও ভারতের মুসলিম শিশুদের প্রথমে কোরআন এবং পরে হাফিজের কবিতা মুখস্থ করানো হতো। হাফিজের কবিতায় রূপক, দ্ব্যর্থবোধকতা এবং আধ্যাত্মিকতার যে প্রকাশ ছিল, তা এই অঞ্চলের মুসলিমদের চিন্তাধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় ফারসি কবিতার সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব রয়ে গেছে সুফি সংগীত বা কাওয়ালির মধ্যে। আমির খসরু ছিলেন এর অগ্রদূত। আজও পাকিস্তানের মাজারগুলোতে বা বিয়েবাড়িতে আমির খসরুর ফারসি কবিতা গাওয়া হয়, যদিও গায়ক বা শ্রোতাদের খুব কম মানুষই এখন এই ভাষা বোঝেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে দাফতরিক কাজে ফারসি নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই এর দাপট কমতে থাকে। পরবর্তীতে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিন দেশেরই জাতীয় শিক্ষানীতি এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে ফারসি ভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পাকিস্তানে উর্দু থেকে ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে আরবি শব্দ বসানোর চেষ্টা (যেমন ‘খোদা হাফিজ’-এর বদলে ‘আল্লাহ হাফিজ’) এবং ভারতে হিন্দুত্ববাদী সরকারের আমলে বিভিন্ন শহরের ফারসি ও আরবি নাম পরিবর্তন করে সংস্কৃত নাম রাখার প্রবণতা এই ঐতিহ্যের স্মৃতিকে আরও ফিকে করে দিচ্ছে।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে।