সিংগাইরের কৃতি সন্তান ও ডাকসুর প্রথম নারী ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানমের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের কৃতি সন্তান ও ডাকসুর প্রথম নারী ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানমের গত ১২ আগস্ট ১ম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট সবাইকে কাদিয়ে পরপারে চলে যান।

মাহফুজা খানম এর জন্ম কলকাতায় ১৯৪৬ সালের ১৪ই এপ্রিল। তাঁর পিতা মোস্তাফিজুর রহমান খান এবং মাতা সালেহা খানম। বাড়ি সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে। তিনি ঢাকার বাংলা বাজার গার্লস স্কুলে অধ্যয়ন করেছেন। ষাট এর দশকের ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী মাহফুজা খানম আইয়ুবের সামরিক শাসন ও ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের এক লড়াকু সৈনিক ছিলেন। ১৯৬৬-৬৭ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মনোনয়নে ডাকসু’র সহসভাপতি (ভি.পি.) নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে সম্মান ও ১৯৬৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য ১৯৬৮ সালে লন্ডনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি পান। কিন্তু সরকার বিরোধী রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে আইয়ুব খানের দাসানুদাস গভর্নর মোনেম খান তাঁর পাসপোর্টের আবেদন বাতিল করে দেয়।

তিনি ১৯৬৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সে সময়ের হাইকোর্টের আইনজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের খন্ডকালীন অধ্যাপক শফিক আহমেদ (কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের) কে বিয়ে করেন। ব্যরিস্টার শফিক আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, সিটি ল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন। সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের দুই মেয়াদে সভাপতি এবং একবার বার কাউন্সিলের সহসভাপতি ছিলেন। পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় আইনমন্ত্রী হিসেবে (২০০৯-১৪ মেয়াদে) দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ের দু’জন চিকিৎসক ও একজন আইনজীবী।

১৯৭১এ মাহফুজা খানম মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পরে সরকারী কলেজে শিক্ষকতা করেও তিনি এদেশের নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার সকল আন্দোলনে যুক্ত থেকেছেন, যুক্ত থেকেছেন গণমুখী আধুনিক শিক্ষা বাস্তবায়নের সকল আন্দোলনে। তিনি দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন।

মাহফুজা খানম জাতীয় শিশুকিশোর সংগঠন খেলাঘরের সভাপতি ছিলেন। তিনি খেলাঘরের শিশু কিশোরদের আপন সন্তানের মতোই ভালবাসতেন।
তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পারন করেছিলেন।

অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ মাহফুজা খানম জীবনের অধিকাংশ সময়ই গরিব, মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও শান্তির সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিরহংকার সংবেদনশীল মানুষ।

মাহফুজা খানম দীর্ঘদিন ইডেন কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি মানিকগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এবং শিক্ষাবিয়ক পত্রিকা মাসিক শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি “বিশ্ব শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন” এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন অনেকবার। মাহফুজা খানম সবসময়ই শিক্ষায় অবহেলিতদের (বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে) আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য অর্থ সংস্থানের উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭টি শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছেন।

তিনি ২০০৯ সালে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এবং ২০১৮-২০২১ সময়কালে সভাপতি হিসেবে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইতিহাস একাডেমির নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি ঢাকার মানিকগঞ্জ সমিতির সভাপতি, পেশাজীবি নারী সমাজের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২১ সালে একুশে পদক প্রদানে সম্মানিত করে। এছাড়া নারী অধিকার আন্দোলন, নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও নারী শিক্ষায় ভূমিকা রাখায় ২০১২ সালে তাঁকে ‘বেগম রোকেয়া পদক’, ও অনন্য নারী হিসেবে তাঁকে ২০১৩ সালে “অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার” প্রদান করা হয়। এছাড়াও টিভি চ্যানেল আরটিভি থেকে তিনি “জয়া আলোকিত নারী-২০১৭” পুরস্কার লাভ করেন।-সংগৃহীত

শিরোনাম