আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত কারখানা কর্মীর ২০ লাখ বইয়ের পাঠাগার! পেশায় ছিলেন চিনিকলের এক সাধারণ টাইমকিপার। কিন্তু নেশা ছিল বই জমানো। সেই নেশা থেকেই দীর্ঘ পাঁচ দশকে ভারতের কর্নাটক রাজ্যের পাণ্ডবপুরায় এক বিশাল ভবনে ২০ লাখ বইয়ের এক অনন্য সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন ৭৯ বছর বয়সী আঙ্কে গৌড়া। শিক্ষার প্রসারে এই অসাধারণ অবদানের জন্য সম্প্রতি ভারত সরকার তাকে দেশটির অন্যতম সম্মানজনক বেসামরিক পদক ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে। কর্নাটকের মান্ডিয়া জেলার এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া গৌড়ার কাছে শৈশবে বই ছিল এক বিলাসিতা। তিনি বলেন, গ্রামে বড় হয়েছি, পড়ার মতো বই পেতাম না। কিন্তু বইয়ের প্রতি আমার সবসময় এক তীব্র কৌতূহল ছিল। ভাবতাম, প্রচুর বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করব। অবসরপ্রাপ্ত কারখানা কর্মীর ২০ লাখ বইয়ের পাঠাগার
শৈশবে বাবার কৃষি কাজে সহায়তার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন তিনি। শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য ছোট আকারে বই জমানো শুরু করেন। খাওয়ার টাকা বাঁচিয়েও তিনি বই কিনতেন। এক সময় বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ শুরু করলেও এক শিক্ষকের পরামর্শে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করেন এবং কন্নড় ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর পাণ্ডবপুরা সুগার ফ্যাক্টরিতে কাজ নেন। কারখানায় ৩৩ বছরের কর্মজীবনে গৌড়া তার বেতনের দুই-তৃতীয়াংশই বই কেনার পেছনে ব্যয় করতেন। বাকি টাকায় চলত সংসার। বাড়তি উপার্জনের জন্য তিনি গরু পালন করে দুধ বিক্রি করতেন এবং ইনস্যুরেন্স এজেন্টের কাজও করেছেন। কন্নড় সাহিত্য পরিষদের বিভিন্ন সম্মেলনে গিয়ে তিনি ছাড় মূল্যে প্রচুর বই সংগ্রহ করতেন।
বইয়ের সংখ্যা যখন ৫০ হাজারে দাঁড়াল, তখন সেগুলো রাখার জায়গা হচ্ছিল না। গৌড়ার এই অদম্য স্পৃহা দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। তিনি ১৫ হাজার ৮০০ বর্গফুটের একটি বিশাল ভবন তৈরি করে দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় বিধায়কের উদ্যোগে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এইচডি কুমারস্বামী আরও দুটি ভবন নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেন। অবসরপ্রাপ্ত কারখানা কর্মীর ২০ লাখ বইয়ের পাঠাগার। গৌড়ার এই পাঠাগারে বাইবেলের বিরল সংস্করণ থেকে শুরু করে কল্পনাতীত সব বিষয়ের বই রয়েছে। এখানে কোনও পেশাদার লাইব্রেরিয়ান নেই। বইগুলো তাকে বা মেঝেতে কিছুটা অগোছালোভাবে স্তূপ করে রাখা। এমনকি ভবনের বাইরে বস্তাবন্দি অবস্থায় আছে আরও প্রায় ৮ লাখ বই। তবে নিয়মিত পাঠকরা জানান, কোন বই কোথায় আছে তা গৌড়া মুহূর্তের মধ্যেই বলে দিতে পারেন। বর্তমানে প্রতিদিন ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও বইপ্রেমীরা বিনামূল্যে এই পাঠাগার ব্যবহার করছেন। সপরিবার পাঠাগারের এক কোণেই বসবাস করেন এই সংগ্রাহক।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গৌড়া কিছুটা দার্শনিক। তিনি বলেন, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আর শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। আমি আমার সেরাটা দিয়েছি, এখন সরকার ও সাধারণ মানুষের উচিত এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।